দশম পয়েন্ট

17. Page

দশম পয়েন্টঃ

( قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ )

 (হে নবী) তাদের বলেন: যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস তাহলে আমার অনুসরণ করো, তবেই আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন। (সূরা আল- ইমরান ৩১)

আল্লাহ তায়ালার এই বাণীটি একটি সংক্ষিপ্ত মু’জিযা । কেননা অসংখ্য বাক্য এই তিনটি বাক্যে প্রবেশ করেছে। যেমনঃ

           এই আয়াত বলছেঃ যদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান আন। তাহলে কোন সন্দেহ নেই যে, তোমরা অচিরেই আল্লাহকে ভালবাসবে আর যেহেতু তোমরা আল্লাহ কে ভালবাস তাহলে তোমরা অবশ্যই সে রূপ আচরন ও কাজ করবে যেভাবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা পছন্দ করেন। আর সেটা হল, যে যাকে ভালবাসে সে তার অনুরূপ বা সাদৃশ্য ধারণ করে। তার সাদৃশ্য ধারণ করার অর্থ হল তার অনুসরণ করা, আনুগত্য করা। এই সকল বাক্য হল কোরআনের ঐ বাক্যের সংক্ষিপ্ত তাফসীর , যা দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে উচ্চাঙ্গীণ উদ্দেশ্য হল মহান আল্লাহর মহব্বত বা ভালবাসা অর্জন করা । আর এই আয়াতটি ইশারা করছে যে এই উচ্চাঙ্গীণ উদ্দেশ্য অর্জনের পথ হল আল্লাহর হাবীবের আনুগত্য করা অনুসরণ করা, তাঁর সুন্নাতের পাবন্দ হওয়া। সুতরাং এই জায়গায় তিনটি পয়েন্ট সাব্যস্ত হল যা উল্লেখিত বিষয়ের গুড় তাৎপর্য অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ভাবে তুলে ধরবে। প্রথম পয়েন্ট: অবশ্যই মানুষকে এই বিশ্ব জগতের স্রষ্টার প্রতি সীমাহীন ভালবাসার প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। কেননা মানুষের স্বভাব হল সুন্দরের প্রতি ভালবাসা, কামালিয়াতের প্রতি আকর্ষণ ও ইহসানের প্রতি অনুরাগ। এই ভালবাসা জামালীয়াত, কামালীয়াত ও ইহসানের স্থর অনুযায়ী বৃদ্ধি পায়। কখনো তা ভালবাসার চুড়ান্ত স্থরে পৌছায়।

অতি ছোট আকৃতির এই মানুষের ছোট অন্তরে বিশ্বজহানের মত বড় ভালবাসা রয়েছে। 


           

18. Page

মানুষের স্মৃতি শক্তি যার আয়তন কলবের মধ্যে ছোট একটি শষ্য দানার মত যা দিয়ে মানুষ হাজার হাজার বই লিখতে সক্ষম যা প্রমাণ করে যে, এই ছোট্ট অন্তর সমস্থ বিশ্বজগতকে ধারণ করতে সক্ষম এবং অনুরূপ ভাবে বিশ্বজগতের মত প্রশস্ত ভালবাসাও বহন করতে সক্ষম।

যেহেতু মানুষের স্বভাব হল ইহসান ,সৌন্দর্য ও পূর্ণতার প্রতি সীমাহীন ভালবাসা । আর বিশ্বজহানের সৃষ্টিকর্তা হলেন মহাপবিত্র সৌন্দর্যের আধার যা বিশ্বজগতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাঁর সৃষ্টির নৈসর্গিক দৃশ্য স্বভাবিক ভাবে তা প্রমাণ করে । আর সীমাহীন পবিত্র পূর্ণতা যা এই সৃষ্টিকুলের মাঝে প্রকাশিত কারুকার্য খচিত নকশা আবশ্যিক ভাবে তা প্রমাণ কারে। আর অফুরন্ত ইহসান যার অস্থিত্ব নিশ্চিত ভাবে প্রতিষ্টিত । বরং তা সকল প্রাণীকুলের মাঝে তাঁর সীমাহীন বিভিন্ন ধরনের দয়া ও অনুগ্রহ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমে তা প্রতিষ্টিত । সুতরাং ঐ সৌন্দর্য পূর্ণতা ও ইহসান দাবী করে যে মানুষের মধ্যে সীমাহীন ভালবাসা থাকা । যেহেতু মানুষের মধ্যে এগুলো বুঝা ও অনুধাবন করার ক্ষমতা সবচেয় বেশী । তারাই ইহার সবচেয়ে মুখাপেক্ষী । এই সম্পের্কে সবচেয়ে বেশী চিন্তাশীল ও উৎসুক ।

           যেহেতু মহীয়ান সৃষ্টিকর্তার প্রতি মানুষের সীমাহীন ভলবাসার ঝোঁক প্রবণতা রয়েছে তাই ঐ সৃষ্টিকর্তা তাঁর সৌন্দর্য ,পূর্ণতা ও ইহসানের বিনিময়ে অন্য যে কেউ থেকে তিনি হলেন সবচেয়ে বেশী ভালবাসা পাওয়ার, প্রিয় হওয়ার অধিকারী । এমনকি একজন বিশ্বাসী মুমিনের মধ্যে যে ধরনের ভালবাসা ও নিবীড় সম্পর্ক থাকে তার জীবনের প্রতি , বেঁচে থাকার প্রতি, তার দুনিয়া ও নিজের নফসের প্রতি এবং সমস্ত সৃষ্টিকুলের প্রতি এগুলো সবই ঐ ইলাহী ভালবাসার আয়োজনেরই কিছু ছিটে ফুঁটা। বরং মানুষের মধ্যে যে সকল নিদর্শন ও অনুভূতি রয়েছে তার সবই ঐ ভালবাসার আয়োজনেরই রূপান্তর ও ছিটে ফুঁটা যা বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করেছে।

          এটা জানাকথা যে, মানুষ যেভাবে তার ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দে আনন্দ পায় অনুরূপ তার সাথে সম্পৃক্ত যারা তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দেও সে আনন্দ পায় । অনুরূপ ভাবে যে তাকে বিপদ আপদ থেকে উদ্ধার করে বাঁচিয়ে রাখে তাকেও সে ভালবাসে ।


19. Page

সুতরাং মানুষ এই রূহানী অবস্থার উপর ভিত্তি করে সকল মানুষের উপর আল্লাহ তা’য়ালার যত প্রকার পরিপূর্ণ ইহসান ও নেয়ামত রয়েছে তার কোন একটি নেয়ামতের উপর যদি চিন্তা করে তাহলে অবশ্যই মানুষ বলতে বাধ্য হবে যে, যেরূপ ভাবে আমার সৃষ্টিকর্তা চিরস্থায়ী অন্ধকারাচ্ছন্ন অস্থিত্বহীনতা থেকে আমাকে বাঁচিয়েছেন এবং এই বিশ্বজগতের এই সুন্দর দুনিয়াতে আমাকে অস্থিত্ববান করেছেন । অনুরূাপভাবে পূনরায় আমাকে চিরবিলীন ও অস্থিত্বহীনতা থেকে বাঁচাবেন। যা আমার মৃত্যু হওয়ার পর বাস্তবায়িত হবে। বরং তিনি আমাকে ঐ জগতে চিরস্থায়ী ও অসম্ভব সুন্দর বিশ্ব দান করবেন। অচিরেই আমাকে এমন প্রকাশ্য ও গোপনীয় অনুভুতি ও চেতনা দান করবেন যাতে ঐ জগতের সকর প্রকার উপভোগ্য স্বাদ সৌন্দর্য ও আনন্দ থেকে উপকৃত হবে। আনন্দ ও বিনোদনে ঘুরে বেড়াবে। অনুরূপভাবে ঐ সকল নেয়ামত ও অনুগ্রহ আমার আত্মীয় স্বজন , সন্তানাদী ও প্রীয়জনদেরকেও পরিপূর্ণভাবে দান করবেন যদেরকে আমি খুব বেশী ভালবাসি এবং তাদের সাথে আমি গভীর বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের উপর ঐ সকল নেয়ামত ও ইহসান কোন এক ভাবে আমার দিকেই ফিরে আসে । তাই তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দে আমি আনন্দ উপভোগ করি।  

           যেহেতু মানুষ ইহসানের প্রতি দাসত্বের পর্যয়ের ভালবাসা পোষণ করে । আর আরবীতে একটি প্রবাদ আছে ” الإِنْسَانُ عَبْدٌ لِلْاحْسَان” ” মানুষ ইহসানের দাস’ সুতরাং কোন সন্দেহ নেই যে, ঐ চিরস্থায়ী সীমাহীন ইহসানের বিনিময়ে মানুষ বলবেঃ

           “যদি আমার অন্তর বিশ্বজগতের মত বড় হত তাহলে আমি ঐ ইহসানের প্রতি ভালবাসায় তা পরিপূর্ণ করে রাখতাম । যদি বাস্তবে আমি ভালবাসা বহন করতে সক্ষম না হই তাহলে নিশ্চয় আমি তা গ্রহণ করব ইচ্ছা আকাংখা , ঈমান, আগ্রহ গ্রহণ ও প্রস্ত ুতির মাধ্যমে । ”

           আর এভাবেই তুমি প্রত্যেকের ভালবাসা কে মাপতে পার যে ভালবাসা প্রকাশ করে সৌন্দর্য পরিপূর্ণতা ও ইহসানের প্রতি । যা আমরা ইতিপূর্বে সংক্ষেপে ইঙ্গিত করেছি। 


20. Page

কিন্তু অবিশ্বাসী তার সীমাহীন শত্রুতা গোপন রাখে । এমনকি সৃষ্টিকুলের প্রতি জুলুম, তুচ্ছ তাচ্ছিল্লের মাধ্যমে শত্রুতা পোষণ করে ।

দ্বিতীয় বিষয়ঃ নিশ্চয় আল্লাহর ভালবাসা মুহাম্মদ (সাঃ) এর আনুগত্যকে আবশ্যক করে । কেননা আল্লাহর ভালবাসা হল তিনি যে সকল কাজে সন্তুষ্ট হন সে সকল কাজ করা। রাসূল (সাঃ) এর সুমহান ব্যক্তিত্বে আল্লাহর সন্তুষ্টি পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু মুহাম্মদ (সাঃ) এর ব্যক্তিত্ব তাঁর চলন বলন এর সাদৃশ্য ধারণ দুধরনের হয়।

      প্রথমতঃ আল্লাহর ভালবাসার দিক থেকে । যেহেতু তাঁর আদেশের আনুগত্য ও তাঁর সন্তুষ্টি অনুযায়ী চলাফিরা করা দাবী করে ঐ আনুগত্যের। কেননা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ইমাম হলেন মুহাম্মদ (সাঃ) নিজে।

        দ্বিতীয়ত ঃ যেহেতু ব্যক্তি মুহাম্মদ (সাঃ) হলেন মানুষের সীমাহীন পরিপূর্ণ নেয়ামত লাভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওসীলা । সুতরাং অবশ্যই আল্লাহ তা’য়ালার বিবেচনায় মুহাম্মদ (সাঃ) হলেন সীমাহীন ভালবাসা পাওয়ার অধিকারী । আর মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতি হল যাকে সে ভালবাসে তার সাদৃশ্য ধারণ করা যদি তা সম্ভব হয়। সুতরাং যারা আল্লাহর হাবীব কে ভালবাসে তাদের উপর কর্তব্য হল রাসূল (সাঃ) এর সাদৃশ্য ধারণ করা তাঁর সুন্নাতের অনুসরনের মাধ্যমে।


তৃতীয়ত বিষয়ঃ আল্লাহর রহমত যেভাবে সীমাহীন অনুরূপ তার ভালবাসাও সীমাহীন। যেভাবে তিনি নিজেকে বিশ্বজগতে তাঁর সকল সৃষ্টির সৌন্দর্যের মাধ্যমে ঐগুলোকে মনোমোগ্ধকর সজ্জিত করনের মাধ্যমে সীমাহীন প্রিয় করাকে ভালাবাসেন, । অনুরূপভাবে তিনি তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান ,জ্ঞানবান তাদেরকেও ভালবাসেন যারা তাঁর সৃষ্টিকুলকে ভালবাসে। বিশেষ করে যারা তাঁর সৃষ্টিকুলকে ও প্রিয় হওয়াকে ভালবাসের মাধ্যমে গ্রহণ করে । সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তি স্বতস্ফুর্তভাবে বুঝতে পারবে যে আল্লাহর ভালবাসার দৃষ্টি আকর্ষণ করাটা কত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চাঙ্গীন ওভিপ্রায় , জান্নাতের সকল কমনীয়তা , সৌন্দর্য ও নেয়ামত সমূহ যার রহমতের স্ফুরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। 

      

21. Page

যেহেতু আল্লাহর কালামের ভাষ্য অনুযায়ী রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাতের আনুগত্য ছাড়া আল্লাহর ভালবাসা অর্জন করা যাবেনা । সুতরাং রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাতের অনুসরণ সবচেয়ে বড় মানবিক লক্ষ হওয়া ও মানবীকতার কাজ হওয়া উচিত।